বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, আসসালাতু ওয়াসসালামু আলা সাইয়্যেদিল আম্বিয়ায়ী ওয়াল মুরসালীন, ওয়া আলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামের আগমন
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে আরবের মরুদুলাল, রহমাতুল্লিল আলামীন, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বিশ্ববাসীর ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির লক্ষ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ঐশী বাণীর শুভ সূচনা করেছিলেন, তা হলো শান্তির ধর্ম ‘আল-ইসলাম’। তাঁর নবুয়তের জ্যোতি বা ‘নূরে’ গোটা জাহান আলোকিত হয়ে ওঠে। দিশাহারা মানবজাতি ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দলে দলে প্রিয় নবীর (সা.) পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে।
‘সুফি সাধকদের পুণ্যভূমি’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস কেবল ধর্মান্তরের ইতিহাস নয়, বরং এটি মানবপ্রেম ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অনন্য উপাখ্যান। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এই ভূখণ্ডে সুফিবাদের যে জোয়ার আসে, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মানস গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামের আগমন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছায় সুফি-দরবেশ ও আউলিয়ায়ে কেরামের হাত ধরে। ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সাহাবী-এ-রাসূল হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর আগমনের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রথম সোপান রচিত হয়। পরবর্তীতে দ্বাদশ শতাব্দীতে সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মতো আধ্যাত্মিক পুরুষদের প্রভাবে এই ধারা বেগবান হয়। তাঁরা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক বা তলোয়ারের জোরে নয়, বরং সাদামাটা জীবনযাপন, বিনয় এবং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। তৎকালীন সমাজের কঠোর বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে তাঁরা শক্তিপ্রয়োগের পরিবর্তে সাম্য, মৈত্রী ও উত্তম চরিত্রের মাধুর্য দিয়ে মানুষকে কাছে টেনেছিলেন।
বাংলার জমিনে সুফিদের বিস্তৃতি বাংলার ৬৪ জেলাজুড়েই মহান সাধকগণের স্মৃতি ও মাজার ছড়িয়ে আছে। হযরত সুফী সৈয়দ নাসির উদ্দীন ইরাকী (রহ.), সিলেটের হযরত শাহজালাল মুজাররদ ইয়ামেনী (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ আউলিয়া, বাগেরহাটের হযরত খান জাহান আলী (রহ.), এবং চট্টগ্রামের বারো আউলিয়া এই আধ্যাত্মিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেন। আধ্যাত্মিক এই মিছিলে শামিল হয়েছেন হযরত শাহ সুলতান রুমী (রহ.), হযরত শাহ মখদুম রূপোস (রহ.), হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এবং হযরত শাহ আমানত (রহ.)-এর মতো মহান মনীষীরা।
পরবর্তী সময়ে এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (রহ.), হযরত গাউসুল আজম বাবাভাণ্ডারী (রহ.), হযরত সুফী ফাতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.), হযরত ছাহেব কেবলা আটরশী (রহ.), হযরত শাহ নেছারুদ্দীন আহমদ শর্ষীনা (রহ.), হযরত হাফেজ মুনীর উদ্দীন হালিশহরী (রহ.), হযরত সৈয়দ রাহাত উল্লাহ নকশবন্দী (রহ.), হযরত খান বাহাদুর আহছানউল্লা (রহ.), হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত কাজী মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হাশেমী (রহ.) এবং হযরত ছাহেব কেবলা ফুলতলী (রহ.) সহ অসংখ্য আউলিয়া-দরবেশ। তাঁদের পবিত্র সমাধিস্থলগুলো আজও ভক্তি ও শ্রদ্ধার মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব সুফি সাধকরা ইসলামি মরমীবাদের (Sufi Mysticism) সাথে দেশীয় লোকাচারের সুনিপুণ সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এমন এক আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, যা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সকলকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাঁদের তিরোধানের পর মাজার বা দরগাহগুলো নিছক উপাসনালয় থাকেনি; বরং কালক্রমে খানকা, মাদ্রাসা ও মসজিদভিত্তিক সমন্বিত জনকল্যাণমূলক কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দরগাহগুলো আর্তমানবতার সেবা (লঙ্গরখানা ও আশ্রয়), জ্ঞানচর্চা এবং সুফি ও বাউল সঙ্গীতের মতো সাংস্কৃতিক বিকাশের বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে। একইসাথে এগুলো হয়ে উঠেছিল স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস।
মাজারের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি
আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র: দরগাহ কেবল সাধকের সমাধিস্থল নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক ‘মূল স্নায়ুকেন্দ্র’। ভক্তরা ওলী-আউলিয়াদের ‘রুহানি’ বা আত্মিক উপস্থিতির সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের জন্য মাজার জিয়ারত করেন। তাঁরা আল্লাহ্-র প্রিয়ভাজন এই সাধকদের ‘বরকত’ (আধ্যাত্মিক কল্যাণ) এবং পরকালীন মুক্তির জন্য তাঁদের ‘শাফায়াত’ বা সুপারিশ কামনা করেন, যা মহান স্রষ্টার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য মাধ্যম।
১. আধ্যাত্মিকতার প্রাণকেন্দ্র: দরগাহ কেবল সাধকের সমাধিস্থল নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক ‘মূল স্নায়ুকেন্দ্র’। ভক্তরা ওলী-আউলিয়াদের ‘রুহানি’ বা আত্মিক উপস্থিতির সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের জন্য মাজার জিয়ারত করেন। তাঁরা আল্লাহ্-র প্রিয়ভাজন এই সাধকদের ‘বরকত’ (আধ্যাত্মিক কল্যাণ) এবং পরকালীন মুক্তির জন্য তাঁদের ‘শাফায়াত’ বা সুপারিশ কামনা করেন, যা মহান স্রষ্টার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য মাধ্যম।
২. জনকল্যাণ ও মানবসেবা: ঐতিহাসিকভাবে খানকা ও দরগাহগুলো সমাজসেবা ও আর্তমানবতার আশ্রস্থল হিসেবে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ক্ষুধার্তদের জন্য ‘লঙ্গরখানা’ বা গণ-ভোজের ব্যবস্থা, পথচারী ও গৃহহীনদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম—সবই এই জনকল্যাণমুখী কাঠামোর অংশ।
৩. সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি: মাজারগুলো সম্মিলিত ইবাদত ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। বিশেষ করে বার্ষিক ‘ওরস শরীফ’ (সাধকের ওফাত দিবস) উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল জনসমাগম কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি সামাজিক পরিচিতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মহামিলনমেলা হিসেবে কাজ করে।
৪. আধ্যাত্মিক নিরাময় ও মানত: রোগমুক্তি, জীবিকা বা সংকটের সমাধানের আশায় ভক্তরা সাধকের ‘কারামত’ (অলৌকিক ক্ষমতা বা কৃপা) লাভের প্রত্যাশায় ‘মানত’ নিয়ে দরবারে আসেন। তাঁদের বিশ্বাস, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত এই সাধকদের ‘উসিলা’ বা মাধ্যমে প্রার্থনা করলে তা মহান আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়।
৫. জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক শিক্ষা: বহু দরগাহ কমপ্লেক্স ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম পাদপীঠ, যেখানে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও মাদ্রাসা বিদ্যমান ছিল। আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা ‘সাজ্জাদানশীন’ পীর সাহেবানরা প্রায়শই গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী হতেন।
তাঁরা নিয়মিত ‘মজলিস’ বা তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে ভক্তদের ‘তাসাউফ’ (সুফিবাদ), আত্মশুদ্ধি এবং ধর্মীয় গ্রন্থের সঠিক ব্যাখ্যা শিক্ষা দিতেন।
ঐতিহ্য ও শিক্ষা
১. তাওহীদ বা একত্ববাদ: সুফি দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘তাওহীদ’ বা মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ একত্ববাদ। সুফিরা বিশ্বাস করেন, সকল ক্ষমতার উৎস একমাত্র আল্লাহ। এখানে সাধক বা ওলী-আউলিয়াদের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও পরম আদর্শ হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়; কিন্তু কোনোভাবেই তাঁদের ঐশ্বরিক সত্তা বা উপাস্য মনে করা হয় না।
২. প্রেম ও প্রত্যক্ষ ভক্তি (ইশ্ক-এ-হাকিকি): সুফি শিক্ষায় স্রষ্টার সাথে বান্দার সম্পর্ক ভীতি বা শাস্তির ভয়ে নয়, বরং তা প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইশ্ক’ বা পরম প্রেমের ভিত্তিতে। সৃষ্টির সেবা ও স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত প্রেমই হলো এই আধ্যাত্মিক সাধনার মূলমন্ত্র, যেখানে ভক্ত নিজেকে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন করে দেন।
৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সহাবস্থান: সুফি সাধকরা ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসার ঘটিয়েছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁদের এই উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইসলাম প্রচারে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, যা মানুষকে ইসলামের শান্তির পতাকাতলে সমবেত করেছে।
৪. সুফি সাধনার মূল অনুষঙ্গ: আত্মশুদ্ধি ও স্রষ্টার নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জিকির’ (স্রষ্টার নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ), ‘মোরাকাবা’ (গভীর আত্মলীন ধ্যান) এবং ‘সামা’ (ভক্তিমূলক সঙ্গীত বা কাওয়ালি)। বাংলায় এই ‘সামা’ বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীতই বাউল, মুর্শিদি বা মারফতি গান হিসেবে লোকসংস্কৃতিতে মিশে আছে।
৫. সমন্বয়বাদী দরগাহ সংস্কৃতি ও ওরস: দরগাহ সংস্কৃতি হলো ইসলামি শরিয়ত ও স্থানীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। এর সবচেয়ে বর্ণাঢ্য প্রকাশ ঘটে বার্ষিক ‘ওরস শরীফ’ বা সাধকের ওফাত দিবসে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো ভক্তের সমাগম, সম্মিলিত প্রার্থনা এবং ‘তাবারক’ বিতরণের মাধ্যমে এই উৎসব এক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মহামিলনমেলায় রূপ নেয়।
৬. পীর-মুর্শিদ ও শাফায়াতের ভূমিকা: ‘পীর’ বা ‘মুর্শিদ’ (আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক) শিষ্য বা মুরিদদের আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করেন বা ‘বায়াত’ প্রদান করেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মাজারে শায়িত মহান সাধকগণ আল্লাহর নৈকট্যধন্য; তাই পরকালীন মুক্তির জন্য তাঁদের ‘উসিলা’ ও ‘শাফায়াত’ (সুপারিশ) মহান আল্লাহর করুণা লাভের অন্যতম মাধ্যম।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
১. সামাজিক সম্প্রীতি ও বিরোধ নিষ্পত্তি: মাজারগুলো গ্রামবাংলার সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। পীর বা সাধকের ‘নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব’-কে সম্মান জানিয়ে স্থানীয় অনেক জটিল বিরোধ ও বিবাদ এখানে শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করা হয়। এছাড়া, লঙ্গরখানায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের একত্রে আহার গ্রহণ সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কার্যকর ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ হিসেবে কাজ করে।
২. অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি: ঐতিহাসিক মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে একটি গতিশীল ‘ধর্মীয় পর্যটন অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। সারা বছর, বিশেষ করে বার্ষিক ওরস শরীফ উপলক্ষে লাখো ভক্তের সমাগম স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করে। এই জনসমাগম স্থানীয় কারুশিল্পী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং আধ্যাত্মিক সঙ্গীতশিল্পীদের (যেমন: কাওয়াল ও বাউল) জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
৩. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিল্পকলার ধারক: মাজারগুলো আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, মৌখিক ইতিহাস ও লোকগাথার জীবন্ত সংগ্রহশালা। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও স্থাপত্যশৈলীতে সুফি দর্শনের প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বাউল, মারফতি, ও গজল-এর মতো মরমী সঙ্গীতধারা লালন ও সংরক্ষণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
৪. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব: ঐতিহাসিকভাবে সুফি সাধকরা প্রবল নৈতিক শক্তির অধিকারী ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় সংকটে শাসকরাও তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁদের প্রভাব আজও কতটা গভীর, তা একটি তথ্যের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়—দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে অন্তত ১১টি জেলার নামকরণ করা হয়েছে এই মহান সুফি সাধকদের নামানুসারে।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের দরগাহ, মাজার ও খানকাহসমূহ এক নিভৃত অথচ গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা থেকে রক্ষা পেতে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা এই পবিত্র স্থানগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন। সে সময় হক্কানী পীর-মাশায়েখ ও খাদেমগণ কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও অন্নই যোগাননি, বরং তাঁদের আধ্যাত্মিক দোয়া ও সাহস দিয়ে বিজয় অর্জনে অসামান্য শক্তি যুগিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—মূলত সুফীবাদেরই শাশ্বত শিক্ষা। আমরা যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল ও বৈষম্যহীন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তার মূল ভিত্তিও এই আধ্যাত্মিক সম্প্রীতি।
বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ
১. জুলাই ২০২৪ পরবর্তী হামলার তীব্রতা ও ব্যাপকতা: ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সুফি মাজারগুলোর ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক ও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শতাব্দীপ্রাচীন এই দরগাহ ও সমাধি-সৌধগুলো কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ‘মৌলিক নোঙ্গর’ বা ভিত্তিস্তম্ভ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ১৮৫টিরও বেশি দরগাহ এবং ৬০০-এর অধিক খানকা (আধ্যাত্মিক কেন্দ্র) বর্বরোচিত হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল ইমারত ভাঙা নয়, বরং এটি জাতির মৌলিক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সত্তার ওপর এক নজিরবিহীন আঘাত।
২. আদর্শিক অজুহাত ও বৈধতার অপচেষ্টা: উগ্র ডানপন্থী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো তথাকথিত ‘ধর্মীয় বিশুদ্ধতা’র দোহাই দিয়ে এবং সুফি চর্চাকে মূলধারার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে এই সহিংসতাকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মূলত, ‘ধর্মনিন্দা’র মিথ্যা অভিযোগ এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা রাজনৈতিকভাবে ধর্মীয় অনুশাসনকে নিজেদের মতো করে নতুন রূপ দিতে চাইছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
৩. সমন্বয়বাদী ইতিহাস ও বহুত্ববাদের ওপর আঘাত: এই হামলাগুলো মূলত বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির বহুস্তরবিশিষ্ট সমন্বয়বাদী ইতিহাসের ওপর সরাসরি আঘাত। সুফি মাজারগুলো এমন এক মিলনকেন্দ্র, যেখানে দীর্ঘকাল ধরে ইসলামি দর্শন, স্থানীয় লোকাচার এবং সনাতন ঐতিহ্যের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিদ্যমান। পীর বা সুফি সাধকের প্রতি এই ভক্তি দক্ষিণ এশীয় ‘গুরু-শিষ্য’ ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে প্রোথিত। মাজার ধ্বংস করা মানে হলো আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী ইতিহাসের দৃশ্যমান প্রমাণ মুছে ফেলা। এই আগ্রাসন মূলত একটি উদার, সহনশীল ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে সেখানে একটি সংকীর্ণ ও একমাত্রিক উগ্র ধর্মীয় পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত।
৪. সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বা প্রশাসনের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা। তারা এই ধারাবাহিক হামলা বন্ধ করতে বা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। দু-একটি ক্ষেত্রে লোকদেখানো মামলা বা গ্রেফতার হলেও, সামগ্রিকভাবে এক ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ (Culture of Impunity) বিরাজ করছে। এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব অথবা এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় চরম অক্ষমতারই ইঙ্গিত দেয়। প্রশাসনের এই দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতা উগ্রবাদীদের আরও উৎসাহিত করছে এবং সুফি ভক্ত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।
সংগঠনের আত্মপ্রকাশ: বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি
এই উগ্রবাদী আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে আমাদের সুফি ঐতিহ্য ও মাজারসমূহ রক্ষায় একটি ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেই তাগিদ থেকেই ২০১৩ সালে একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার সূচনা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে দেশের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দরগাহগুলোর খাদেম ও ভক্তবৃন্দের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ আত্মপ্রকাশ করে। একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এর মূল লক্ষ্য—উগ্রবাদী সহিংসতা মোকাবিলা করা এবং দরগাহ, মাজার ও খানকাসমূহকে সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সুফি সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখা। উল্লেখ্য, সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জনাব মোহাম্মদ তৌহিদুল কাদের চৌধুরী এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং জনকল্যাণমুখী একটি আধ্যাত্মিক সংগঠন। এর মূল লক্ষ্য কোনো মাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং মাজার ও খানকাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সকল প্রকার অনাচার দূর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুফিবাদের প্রকৃত শিক্ষা সমুন্নত রাখা। সংগঠনটির মূল প্রতিপাদ্য হল “মহান আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সা.)-এর নির্দেশিত কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ে আউলিয়ায়ে কেরামের প্রদর্শিত পথেই হোক আমাদের আগামীর পথচলা।”
রূপকল্প (Vision) ও লক্ষ্য (Mission)
• রূপকল্প: বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রধান অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং উগ্রবাদী আদর্শের মোকাবিলা করে একটি সম্প্রীতিময় সমাজ বিনির্মাণ করা।
• লক্ষ্য: নিরাপত্তা বিধান, আইনি সুরক্ষা, তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ এবং সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশব্যাপী সুফি মাজারগুলোর ঐতিহ্য রক্ষা করা।
সংগঠনের মূলনীতি
১. আকিদা ও আমল: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী নবী ও ওলীদের প্রদর্শিত ত্বরিকা মোতাবেক সুশীল সমাজ গঠন।
২. সমাজ সংস্কার: সব ধরনের নাফরমানি ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে সমাজকে রক্ষা করা।
৩. সাংগঠনিক ভিত্তি: শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও ঐক্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা।
৪. মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা: সুফিবাদভিত্তিক ইসলামী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ মুসলিম সমাজের হৃদয়ে সুদৃঢ় করা।
বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটির দায়িত্ব ও কর্মপরিধি
বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটির (বিডিএমজেএসসি) মূল ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব হলো দেশব্যাপী সকল দরগাহ ও মাজারের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সার্বিক নিরাপত্তা, প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় কার্যক্রমের মধ্যে সুষম সমন্বয় সাধন করা। সুফি ঐতিহ্যের সুরক্ষা, জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম পরিচালনা এবং উগ্রবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধে এই কমিটি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। কমিটির বিস্তারিত কর্মপরিধি নিম্নরূপ:
১. শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা:
• কৌশলগত নিরাপত্তা বিন্যাস: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশ, আনসার) ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি দরগাহ ও মাজারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
• জননিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ: পবিত্র ওরস শরীফ বা বিশেষ উৎসব চলাকালীন ভক্তদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতকরণ এবং সুশৃঙ্খল ভিড় ব্যবস্থাপনার (Crowd Management) মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
২. সংরক্ষণ ও অবকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণ:
- প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ: ঐতিহাসিক দরগাহ ও মাজারসমূহের মূল স্থাপত্যশৈলী, শিলালিপি, গম্বুজ ও মিনার সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা।
- সংস্কার ও পুনরুদ্ধার: ক্ষতিগ্রস্ত বা জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলোর সংস্কার এবং ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী ও উপকরণ ব্যবহার করে তা পুনরুদ্ধার (Restoration) করা।
- পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা: মাজার প্রাঙ্গণ ও তৎসংলগ্ন এলাকার পবিত্রতা রক্ষায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৩. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ:
• ধর্মীয় আচার ব্যবস্থাপনা: বার্ষিক ওরস শরীফ, মিলাদ মাহফিল এবং জিকির আসরের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে সঠিক ও সুশৃঙ্খল আয়োজন নিশ্চিত করা।
• সুফি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা: বাংলার চিরায়ত বাউল গান, কাওয়ালি এবং সুফি সাহিত্যের চর্চা, সংরক্ষণ ও প্রচারে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।
• আধ্যাত্মিক শিক্ষা বিস্তার: খানকা ও মাদ্রাসা পরিচালনার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইসলামের শান্তির বাণী ও সুফি দর্শনের নৈতিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া।
৪. জনকল্যাণ ও মানবসেবা:
• লঙ্গরখানা ব্যবস্থাপনা: জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দুস্থ, ভক্ত ও পথচারীদের জন্য লঙ্গরখানার (বিনামূল্যে আহার) মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
• আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা: মুসাফির, গৃহহীন ও অসহায় ভক্তদের জন্য সাময়িক আবাসন এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা।
• আর্থ-সামাজিক সহায়তা: সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক অনুদান, চিকিৎসা সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৫. প্রশাসনিক ও আইনি সুরক্ষা:
• জাতীয় ডেটাবেজ প্রণয়ন: দেশের সকল দরগাহ ও মাজারের তালিকাভুক্তি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত একটি কেন্দ্রীয় নথিপত্র বা রেজিস্ট্রি তৈরি করা।
• আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ: মাজার বা সুফি স্থাপনায় যেকোনো হামলা বা ভাঙচুরকে ‘সাংস্কৃতিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে আইনি লড়াই পরিচালনা ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা।
• নীতি নির্ধারণ ও সমন্বয়: নিয়মিত সভার মাধ্যমে সাংগঠনিক নীতি নির্ধারণ, বাজেট অনুমোদন এবং গৃহীত কার্যক্রমের স্বচ্ছ মূল্যায়ন করা।
৬. গবেষণা ও ডকুমেন্টেশন:
• ইতিহাস সংরক্ষণ: দরগাহ ও মাজার-কেন্দ্রিক ইতিহাস, লোকজ ঐতিহ্য এবং ভক্তদের অভিজ্ঞালব্ধ জ্ঞান লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা।
• ডিজিটাল আর্কাইভিং: আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে (ভিডিও, ছবি, ৩ডি স্ক্যানিং) স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনের ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা।
• গবেষণা সহযোগিতা: সুফি দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সহযোগিতা প্রদান করা।
৭. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বচ্ছ তহবিল ব্যবস্থাপনা:
• সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনা: সরকারি অনুদান, ভক্তদের দান এবং ওয়াকফকৃত সম্পত্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে মাজার পরিচালনার জন্য টেকসই তহবিল গঠন করা।
• স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান: মাজার-কেন্দ্রিক পর্যটনকে উৎসাহিত করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন এবং কারুশিল্পীদের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা।
• স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাবরক্ষণ (Audit) এবং বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৮. জনসচেতনতা ও প্রচার:
• আদর্শিক প্রচার: সাধারণ মানুষের কাছে সুফি দর্শনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মাজার ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা।
• গণমাধ্যম সংযোগ: টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রকাশনার মাধ্যমে সুফি সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা।
• যুব সম্পৃক্ততা: মাজারের স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে তাদের উগ্রবাদ বিমুখ করা।
প্রস্তাবিত “বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় স্বতন্ত্র বোর্ড”
অন্তর্নিহিত কারণসমূহ
১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও, পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কখনোই তাদের পরাজয় মেনে নেয়নি। সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেছে, এই অপশক্তি এবং তাদের উত্তরসূরিরা সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনসহ দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের এই বৈরী কার্যকলাপ বর্তমানে এক রূঢ় বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রটি বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার আড়ালে—স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস মুছে ফেলার নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে। মূলত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে, পবিত্র কুরআন হিফজ বা ধর্মীয় শিক্ষার নামে তারা কোমলমতি শিশুদের মগজধোলাই করছে এবং জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিতে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের অভিযোগও উঠেছে, যা ইসলামের পবিত্রতা ও মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মৌলবাদের যে উগ্র উত্থান ও আস্ফালন লক্ষ্য করা গেছে, তা দেশের বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে শঙ্কিত ও ব্যথিত করেছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এই গোষ্ঠী সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনাশের অপচেষ্টায় লিপ্ত। অথচ, ইসলাম সর্বদাই শান্তি, মানবতা ও ন্যায়বিচারের কথা বলে।
আমাদের মহান স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাজার জিয়ারত ও গিলাফ পরিয়ে সুফিবাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এদেশে ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলাদেশের সকল দরগাহ ও মাজারের উন্নয়ন ও সমন্বয়ের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত বোর্ড গঠন করা।
বঙ্গবন্ধুর সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমানে এগিয়ে এসেছেন ‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি’-র চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ তৌহিদুল কাদের চৌধুরী। তিনি নিজ উদ্যোগে এই কমিটি প্রতিষ্ঠা করে দেশের সকল দরগাহ ও মাজারের মধ্যে এক অনন্য আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলা এবং ইসলামের প্রকৃত শান্তি ও মানবতার বাণী প্রচারের লক্ষ্যে তিনি ‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় স্বতন্ত্র বোর্ড’ গঠনের যে মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দিবালোকের মতোই স্পষ্ট এবং জনকল্যাণমুখী।
গঠন প্রক্রিয়া
‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় স্বতন্ত্র বোর্ড’ একটি সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ এবং জাতীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জাতীয় নীতির প্রতিফলন নিশ্চিতকল্পে এই বোর্ড সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই উচ্চ-পর্যায়ের প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করবে যে, বোর্ডের সকল কার্যক্রম যেন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সাথে সর্বদা সংগতিপূর্ণ থাকে।
বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামোর শীর্ষ নেতৃত্বে থাকবেন একজন প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা বোর্ডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত হবে একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ, যেখানে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের অভিজ্ঞ এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। পর্ষদের এই সদস্যরা মূলত শিক্ষা, ধর্ম, সমাজকল্যাণ এবং স্বরাষ্ট্র (নিরাপত্তা) মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগসমূহ থেকে মনোনীত হবেন। আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই পর্ষদ বহুমুখী পরামর্শ প্রদান, নীতি নির্ধারণ এবং আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে বোর্ডের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন করবে।
বোর্ডের কর্মপরিধি কেবল কেন্দ্রীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। দেশব্যাপী কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে সমন্বয় ও পরিচালনার লক্ষ্যে ৬৪টি জেলায় বোর্ডের নিজস্ব ‘জেলা কার্যালয়’ স্থাপন করা হবে। এই জেলা কার্যালয়গুলোই হবে তৃণমূল পর্যায়ে বোর্ডের যাবতীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু। জেলা কার্যালয়গুলোর মাধ্যমে স্থানীয় দরগাহ-মাজারের সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং, ৬৪টি সমন্বিত কমপ্লেক্সের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি এবং সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখা হবে। কেন্দ্রীয় বোর্ডের নির্দেশনার আলোকে জেলা কার্যালয়গুলো সারা দেশে দরগাহ ও মাজারসমূহের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় নীতিগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে, যা স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতাবিরোধী ও উগ্রবাদী শক্তির যেকোনো নাশকতামূলক তৎপরতা প্রতিহত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
এই সুদৃঢ় প্রশাসনিক কাঠামো দরিদ্র শিশুদের জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার মহৎ লক্ষ্য অর্জনে বোর্ডের সফলতা নিশ্চিত করবে। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধান এই প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করবে।
‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় স্বতন্ত্র বোর্ড’-এর যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা: শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় সংহতি
‘বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় স্বতন্ত্র বোর্ড’ গঠনের পর দেশব্যাপী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এবং জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করতে একটি যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হলো দেশের ৬৪টি জেলায় ‘৬৪টি সমন্বিত দরগাহ মাজার জাতীয় কমপ্লেক্স’ স্থাপন। এই বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের জন্য আধুনিক, নৈতিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইসলামের শান্তির শাশ্বত বাণী প্রচারের এক শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
১. ৬৪ জেলায় সমন্বিত শিক্ষা নগরী ও অবকাঠামো: প্রতিটি জেলায় প্রস্তাবিত এই কমপ্লেক্সগুলো হবে এক একটি সমন্বিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষা নগরী। একই ছাদের নিচে বহুস্তরবিশিষ্ট শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। প্রতিটি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
• একটি জামে মসজিদ ও একটি খানকা শরিফ।
• শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার্থে হোস্টেল।
• একটি পুকুর ও দুস্থ-মুসাফিরদের জন্য লঙ্গরখানা।
২. সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম ও একাডেমিক কাঠামো: সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধনে এখানে পরিচালিত হবে ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা:
• ধর্মীয় বুনিয়াদি শিক্ষা: সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য থাকবে নিরাপদ হিফজখানা, এতিমখানা এবং বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত শিক্ষার জন্য নাজেরা বিভাগ।
• মাদ্রাসা শিক্ষা: ইবতেদায়ী থেকে শুরু করে দাখিল, আলিম, ফাজিল এবং কামিল পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
• সাধারণ ও বিজ্ঞান শিক্ষা: সাধারণ শিক্ষার মূলধারা অক্ষুণ্ণ রেখে এখানে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখাসহ প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি ও এইচএসসি (স্কুল ও কলেজ) স্তর পরিচালিত হবে। আরবি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সমান গুরুত্বারোপ করা হবে।
• বিশেষায়িত দরসে নেজামি: প্রতিটি জেলায় এই কমপ্লেক্সের ভেতরেই একটি করে ‘দরসে নেজামি’ মাদ্রাসা থাকবে। এখানে সাধারণ সিলেবাসের বাইরেও ফারসি, উর্দু এবং আরবির মতো ধ্রুপদি ভাষা ও বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হবে।
৩. উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন: এই মহাপরিকল্পনার অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ হলো উচ্চশিক্ষার বিস্তার। ৬৪ জেলার কমপ্লেক্স ও মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর পাশাপাশি দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটিতে বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ থাকবে।
৪. জাতীয় কর্মসূচিসমূহ: ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতি বছর ৫টি জাতীয় প্রোগ্রামের আয়োজন করা হবে। এর মধ্যে সর্ববৃহৎ কর্মসূচি হবে পবিত্র ১২ই রবিউল আউয়াল উপলক্ষ্যে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল এবং দুই দিনব্যাপী শীর্ষক সেমিনার।
৫. আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রতিনিধি সমাবেশ: রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ৫ দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হবে, যেখানে সারা দেশের প্রায় ৩৭-৩৮ হাজার দরবার শরিফের প্রতিনিধি এবং নির্বাচিত দায়ী ও দাওয়াতী মেহমানরা উপস্থিত থাকবেন। এই সম্মেলনের উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সর্বস্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এই মহৎ উদ্যোগের কৌশলগত ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অপপ্রচার, মগজধোলাই এবং জঙ্গি তৎপরতার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একটি নিরাপদ, নৈতিক ও দেশপ্রেমিক পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তারা দেশের মূলধারায় সম্পৃক্ত হবে এবং আগামীর দায়িত্বশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের বিশ্বাস, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নবদিগন্তের সূচনা করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব কোনো সংগঠন নয়। এটি নিরাপত্তা সুরক্ষা, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম, একাডেমিক গবেষণা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির এক সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। আমাদের ভিশন অত্যন্ত স্পষ্ট—বাংলার আবহমান সুফি ঐতিহ্য ও মাজার সংস্কৃতিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা এবং আগামীর প্রজন্মের কাছে শান্তির এই শাশ্বত বার্তা পৌঁছে দেওয়া। জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলোর সংস্কার এবং আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিডিএমজেএসসি-র পাশে দাঁড়ানো মানে কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সহায়তা করা নয়; বরং এটি বিশ্বমঞ্চে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হওয়া। এটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (Global Cultural Heritage) রক্ষার এক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। আমাদের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বলয়’ তৈরি
মুনাজাত
পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি—হে দয়াময় প্রভু! তুমি তোমার আশেক বান্দাদের এই সংগঠনের প্রতি ইস্তিকামত দান করো। আমাদের দরবারীদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করো। মানব সেবায় যে অঙ্গিকার নিয়ে আমরা তোমার দরবারে হাত তুলেছি, তা সুসম্পাদনের তৌফিক দাও। আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম মাতৃভূমি বাংলাদেশকে নবী-অলী-গাউস-কুতুবগণের উছিলায় চতূর্মুখী সমৃদ্ধশালী করো।
আমীন,
বিজাহিন নবিইল করীম রউফুর রহীম (সা.)।